আমরা বাঙ্গালিরা কোনো উৎসব-পার্বণ এলেই মেতে উঠি নিজেদেরকে নানান রঙে রাঙিয়ে তোলায়। একেকজনের একেক সাজে চারিদিক যেনো গমগম করে আনন্দে। আর আমাদের কাছে এটাই উৎসবের আসল মজা। ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, বৈশাখ,নবান্ন- বছরের একেক সময় জুড়ে উদযাপন করি এইরকম আরো অনেক অনেক উৎসব। আর শুধু উৎসবের সেই একদিনই না,
পুরো মাস জুড়েই আমরা সেই আনন্দের ভাসতে থাকি। এই যেমন কয়দিন আগেই গেলো পহেলা ফাল্গুন। এখন বেশিরভাগ জায়গায়ই দেখা যাবে পুরো মাসজুড়ে লেগেই থাকবে ফাল্গুনের নানান অনুষ্ঠান। আর এই অনুষ্ঠানগুলোয় রমনীরা নিজেদের সাজাবেন মনের আনন্দের সব রঙ মিলিয়ে।
প্রত্যেকটি উৎসবের রয়েছে নিজস্ব রঙ। এই যেমন ফাল্গুনে সবাই পড়ে হলুদ, কমলা ইত্যাদি এইসব উজ্জ্বল রঙ। আবার ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস একসাথে হওয়ায় লালের প্রাধান্যও থাকে অনেক শাড়ি বা জামা সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে। আমি এবার গতানুগতিক রঙগুলোর ধারা থেকে বের হয়ে পড়েছিলাম হট পিঙ্ক কালারের শাড়ি। আমার মনে হয় এই রঙটা যেমন ফাল্গুনের জন্য পরা যায় তেমনি ভালোবাসা দিবসের জন্যও পারফেক্ট। আর পুরো ফাল্গুন মাসজুড়ে এইরকম উজ্জ্বল রঙগুলো পড়লে এমনিতেই মনে সবসময় উৎসবের আমেজ লেগে থাকে। আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আমার ফাল্গুনের লুকটির ডিটেইলস বা কেমন করে আপনি ফাল্গুনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য নিজেকে সাজাতে পারেন তা নিয়ে থাকবে অনেক সাজেশনস।
ফাল্গুনে নিজেকে সাজাতে আমি সবসময় উজ্জ্বল রঙগুলো প্রাধান্য দেই বলেই এবার হট পিঙ্ক কালারের হাফ সিল্কের শাড়িটি পড়েছিলাম। ফাল্গুনে আপনারা সুতি, সিল্ক, অরগানজা বা জামদানি ইত্যাদি দেশীয় মোটিফের শাড়িগুলো বেছে নিতে পারেন। পেয়ে যাবেন বিভিন্ন অনলাইন পেইজ বা ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে খুব সহজেই এবং কম দামে। সাথে ছিলো মিনাকারি করা ব্লাউজ। এটাও নিয়েছিলাম নিউ মার্কেট থেকেই। যেকোনো অনুষ্ঠানেই শাড়ি যদি সিম্পল হয় সবসময় চেষ্টা করবেন ব্লাউজ একটু গরজিয়াস বা ইউনিক কাটিং এর নিতে। এতে আপনার সাজ এবং ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠবে খুব সুন্দর ভাবে।
কেমন হবে মেকওভার?
যেহেতু ফাল্গুন তাই বুঝতেই পারছেন মেকওভার হবে কালারফুল। বিভিন্ন রঙ দিয়ে চোখ আর ঠোঁট রাঙিয়ে নিজেকে সাজাতে ভালোবাসেন নারীরা এই দিনে। কিন্ত কালারফুল মেকাপ করতে গিয়ে তা যেনো আবার বেশি না হয়ে যায় বা বেমানান না হয়ে যায় এই বিষয় টা খেয়াল রাখা লাগবে।
ফাল্গুন মেকাপের ক্ষেত্রে আপনি দুই ধরনের লুক নিতে পারেন। একটি হলো যারা হালকার সাজের মধ্যে গরজিয়াস একটা লুক চান তারা চোখের মেকাপ হালকা রেখে ঠোঁটে ব্রাইট কালারের লিপস্টিক দিতে পারেন আর আরেকটি হলো যারা একটু গ্ল্যামারাস টাইপ গরজিয়াস লুক চান তারা চোখের মেকাপে হলুদ, কমলা,নীল,গোলাপি,সবুজ এইরকম ব্রাইট কালারগুলো দিয়ে হালকা ন্যুড একটা লিপস্টিক দিয়ে নিতে পারেন। আবার যারা একটু নো-মেকাপ মেকাপ লুক গুলো নিতে বেশি পছন্দ করেন তাদের চোখের মেকাপ হবে একদম লাইট বা শুধু ট্রানজিশান কালার দিয়ে করা আর লিপস্টিকও হবে একদম ন্যুড কোনো শেইড। আর এই লুক গুলোর সাথে পরে নিবেন একদম ন্যাচারাল লুকিং একটা আইল্যাশ আর ন্যুড কাজল। আর যারা আইল্যাশ পরতে চান না তারা অবশ্যই ভালো ওয়াটারপ্রুফ মাসকারা ব্যাবহার করবেন। আর আই মেকাপে চাইলে আই-লিডে একটু গ্লিটার অ্যাড করে নিতে পারেন। ওহ! আর আইলাইনারের কথা তো ভুলে গেলে চলবে না। যেকোনো আইলুকের সাথেই দিতে পারেন নিজের পছন্দমতো মোটা বা চিকন করে আইলাইনার। যাদের চোখ বড় তারা একটু মোটা করে আইলাইনার দিবেন আর যাদের চোখ ছোট তারা চিকন করে আইলাইনার দিবেন। এখন বিভিন্ন কালারফুল আইলাইনার দেয়ার ট্রেন্ড চলছে। তাই আইলুক যেমনই হোক সাথে একটু দিয়ে নিতে পারেন নীল,কমলা,হলুদ বা সবুজের মতো রঙ-য়ের আইলাইনার। এতে করে মেকাপ লুক দেখতে লাগবে সবচেয়ে ভিন্ন আর ট্রেন্ডি।
ফাল্গুন মেকাপের বেইস করা উচিত হালকা যাতে দেখতে ন্যাচারাল লাগে। এর জন্য বেছে নিতে পারেন লাইট টু মিডিয়াম কভারেজ দেয় এইরকম ফাউন্ডেশন এবং কন্সিলার। সাথে প্রাইমার, ব্লাশ-অন,হাইলাইটার, ব্রোঞ্জার ইত্যাদি সবই নিজের পছন্দমতো কম বা বেশি দিয়ে নিতে ভুলবেন না।
এবার আসি আমার এবারের ফাল্গুন লুকের ডিটেইলসে। এবারের লুকটা আমি করেছিলাম গোলাপি শাড়ীর সাথে কন্ট্রাস্ট করে কমলা রঙকে প্রাধান্য দিয়ে। কারণ আমার কাছে এই কম্বিনেশনটা বেশ ট্রেন্ডি মনে হয় ফাল্গুনের লুক হিসেবে খুব মানানসইও।
আমি একটু লাইট কিন্তু ডিউয়ি মেকাপ করতে চেয়েছিলাম তাই প্রথমেই ফ্লোরমারের ইলুমিনেটিং প্রাইমারটা অ্যাপ্লাই করে নিয়েছিলাম। এরপর ফ্লোরমার স্ট্রোবিং ক্রিম দিয়ে নিয়েছিলাম যাতে ফাউন্ডেশন দিলে তা ডিউয়ি লাগে। এরপর ফ্লোরমার ফিউশন পাওয়ার ফাউন্ডেশন সিরাম দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করে নিয়েছি। যেহেতু আমি লাইট বেইস চাচ্ছিলাম আর এই ফাউন্ডেশনটি খুবই ন্যাচারাল একটা ফিনিশিং দেয় তাই এই ফাউন্ডেশনটিই বেছে নিয়েছিলাম। এরপর ফ্লোরমার স্টে পারফেক্ট কন্সিলার দিয়েছি শুধু চোখের নিচে। আমার ড্রাই স্কিন তাই লুজ পাউডার দিয়ে বেকিং না করে ফ্লোরমার ওয়েট এন্ড ড্রাই কম্প্যাক্ট টা দিয়ে শুধু একটু সেট করে নিয়েছি বেইস টা।বেইস করা হলে একে একে ফ্লোরমার ব্রোঞ্জিং পাউডার দিয়ে লাইট ব্রোঞ্জিং, বেকড ব্লাশ দিয়ে ব্লাশ-অন এবং ইলুমিনেটিং পাউডার দিয়ে হাইলাইটার দিয়ে মুখের মেকাপ কমপ্লিট করি। এরপর চোখের মেকাপে যেহেতু কমলা রঙকে প্রাধান্য দিয়েছিলাম তাই প্রথমে গোলাপি একটি আইশ্যাডো ট্রানজিশন কালার হিসেবে ব্যাবহার করে পুরো আই লিড কমলা আইশ্যাডো দিয়ে ব্লেন্ড করে নেই। চোখের মেকাপে কোনো আইলাইনার ব্যাবহার করিনি। এরপর ফ্লোরমার বিগ এন্ড বোল্ড মাসকারা দেই উপরের এবং নিচের আইল্যাশে। আমি যেহেতু লুকটা একদম মিনিমাল আর স্নিগ্ধ রাখতে চেয়েছিলাম তাই কোনো ফেইক আইল্যাশ বা লেন্স পরিনি। কিন্তু আপনি চাইলে পরতে পারেন। ওয়াটার লাইনে দিয়েছিলাম একটা ন্যুড কাজল। ফ্লোরমার সিল্ক ম্যাট লিপস্টিক থেকে বেছে নিয়েছিলাম ন্যুড পিঙ্ক টাইপ একটি শেইড। আর সবশেষে ফ্লোরমার অল-ডে ফিক্স সেটিংস স্প্রে দিয়ে মেকাপ সেট করে নেই। ব্যস, এই ছিলো আমার ফাল্গুন লুকের ডিটেইলস।
আপনিও চাইলে এই লুকটি করে ফেলতে পারেন খুব সহজেই,ঝটপট।
হেয়ারস্টাইল –
হেয়ারস্টাইল হতে পারে খোলা বা বাঁধা, আপনার সুবিধা অনুযায়ী। চুল খোলা রাখলে একটু স্ট্রেইট বা ব্লো-ড্রাই করে নিতে পারেন। আর কানের কোণায় গুজে নিতে পারেন আপনার যেকোনো পছন্দের ফুল। আর চুল বাধা রাখতে চাইলে চুল হালকা কার্ল করে একটা মেসি খোপা করে নিতে পারেন বা একটা সিম্পল খোপা আর অবশ্যই খোপায় ফুল দিতে ভুলবেন না। কারণ ফুল ছাড়া ফাল্গুনের লুকটাই যেনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চুল খোলা রাখলে আমার মতো করে হাতে পরতে পারেন ফুল।
আমি আমার মেকাপে মোটামুটি ফ্লোরমারেরই সব প্রডাক্ট ব্যাবহার করেছি। কারণ শুরু থেকেই এটি আমার অন্যতম প্রিয় একটি মেকাপ ব্র্যান্ড আবার ফাল্গুন উপলক্ষ্যে অনেক অনেক ডিসকাউন্ট থাকায় পছন্দের সবকিছুই কিনে নিতে পেরেছিলাম বাজেটের মধ্যে। আর উৎসবকে ঘিরে প্রতি বছরই পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলে ফ্লোরমারের মেকাপে অনেক অনেক অফার যা আমি কখনোই মিস করিনা।
যাই হোক, সবশেষে বলবো উৎসবের রঙে সবসময়ই নিজেকে রাঙানো বাদ দেয়া যাবেনা। ছোট থেকে ছোট যেকোনো উৎসবই চেস্টা করবেন সেলিব্রেট করতে। কারণ, দৈনিক জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে নিজেকে খুশি রাখা অনেক জরুরী। আর এই উৎসবগুলোই আমাদের খুশির অন্যতম একটা মাধ্যম হতে পারে। আর আপনি নিজে খুশি থাকলে আপনার আশেপাশের সবকিছুই অনেক সহজ আর সুন্দর মনে হবে যা আপনার জীবনে সাফল্যের মাত্রা অবশ্যই বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে।
লিখেছেন –
রাবেয়া চৌধুরী পিয়া